বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও উন্নয়নের কাঠের চশমা

প্রেক্ষাপটঃ সারাদেশে লোডশেডিং এর মহাভোগান্তি, ১৬ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে দুই হাজার মেগাওয়াট এর বেশি ঘাটতি। চাষবাসের কাজে সেচের পানি সরবরাহেও ঘটছে ব্যাঘাত।
প্রশ্নঃ দেশে বিদ্যুৎ এর উৎপাদন ক্ষমতা ২৭,৭৯১ মেগাওয়াট তবুও ১৬ হাজার মেগাওয়াটের চাহিদা মেটাতে হিমশিম কেন বিদ্যুৎ বিভাগের?
উন্নয়ন নামের যে চাঁদের হাট বসিয়েছিলো সরকার গত ১৬ বছর, বেরিয়ে আসছে তার আড়ালের থলের বিড়াল! মানে? জেনে আসি বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু জিনিস চলুন।
১. জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে বিগত স্বৈরাচারী সরকার। চাহিদাকেও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ফলে প্রতি বছর বড় সময় অলস বসিয়ে রাখতে হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, দিতে হয়েছে অলস কেন্দ্রের ভাড়া। খরচের চাপ সামলাতে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বেড়েছে। সরকারের দায় বেড়েছে। অথচ তিন বছর ধরে গরম বাড়লেই লোডশেডিংয়ে ভুগতে হচ্ছে মানুষকে। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েও পড়েছে একই সমস্যায়। এতো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। ফলে বেড়েছে লোডশেডিং। গতকাল মঙ্গলবার তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে লোডশেডিং।
২. বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় সুবিধাভোগী ছিল সামিট গ্রুপ। এ গ্রুপটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। এতে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। এই একক কোম্পানির কাছে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ, তার বিকল্প না থাকায় আরো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

৩. জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমেছে। ভারতের সরকারি-বেসরকারি খাতের পাশাপাশি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও ৫০০ মেগাওয়াট কম আসছে। আমদানির ক্ষেত্রে বিকল্প না রাখায় এর প্রভাব আরো বাজেভাবে পড়ছে দেশের বিদ্যুৎ সরবারহে।
৪. দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি, উৎপাদন বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ গুণ। আর কেন্দ্রভাড়া বেড়েছে ১৬ গুণ। বাড়তি উৎপাদনক্ষমতার বিপরীতে কেন্দ্রভাড়া দিতে গিয়ে সরকার বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। তাতেও ওঠেনি উৎপাদন খরচ। তখন দিতে হয়েছে বিপুল ভর্তুকি, যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ ফেলেছে। চাপে পড়েছে অর্থনীতিও। আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ১৫ বছরে খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।
৫. গ্যাসের বিল, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল, ভারতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল মিলে পিডিবির বকেয়া এখন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বকেয়ার চাপ থাকায় বেসরকারি খাতের তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকেও সর্বোচ্চ চাহিদায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব ইউনিট।
৬. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সব কোম্পানির বোর্ডে আমলাদের আধিপত্য বিস্তার ছিলো। “দরপত্র ছাড়া খেয়াল-খুশির চুক্তি করে অসাধু ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে বিপদে ফেলতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে এটি করেছে। কেন্দ্রভাড়া দিতে দিতেই দেউলিয়া হওয়ার দশা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি সংশোধন বা বাতিল করতে হবে।” (ক্যাব জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম) বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রথমে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা যুক্ত হলেও পরে আওয়ামী লীগের নেতারা নিতে থাকেন বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা। মূলত বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে এভাবে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।

৭. যমুনা টিভির সাক্ষাৎকারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেন, “যেরকম টাইপের বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন স্বল্পমূল্যে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে তা নেই দেশে। নির্দিষ্টভাবে বলতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যতবেশি ব্যবহার করা হবে ততবেশি খরচ বাড়বে।” উন্নয়নের মহানাট্য দেখাতে তারা শুধু এরকম দামি দামি বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়েই গেছে আর এর আড়ালে লুটপাট করেছে হাজার কোটি টাকা।
মুনাফা ও লুণ্ঠনের রাজ্য কায়েম করা হয়েছিলো বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে। লেবু বেশি চাপলে যেমন তিতা হয়ে যায়, তেমনি চোখের ধুলো দিয়ে মানুষকে উন্নয়নের মহাকাব্য শুনিয়ে এসেছে তারা। ব্যাপারটা এমন যে, প্রথম প্রথম দেখে মনে হয়েছে রসগোল্লা, এরপর বের হয়েছে সেটা করলার মতো তিতা! আজকের প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে যেমন বলা হলো মেগা প্রজেক্টের নামে লুটপাটের কথা, এরকম কতকিছু যে হয়েছে গত দেড় দশক তা হিসেবের বাইরে।
এরমধ্যে গতকাল শেখ হাসিনার দেড় দশকের এই খাতের লুটপাটের প্রধান পথদ্রষ্টা বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খনিজ উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী গ্রেফতার হলো, দেখা যাক আর কি কি ভন্ডামীর মহাকাব্য বের হয়!
পরিশেষে: আজকের ডঃ মোহাম্মদ ইউনূসের ভাষণের একটা কথা দিয়ে শেষ করবো, “ধৈর্য্য ধরুন-এই কথাটি আমি মোটেই আপনাদের বলবো না, আমরা সবাই অধৈর্য্য হয়ে পড়েছি, এতসব কাজ কখন যে শেষ হবে এটা চিন্তা করে। আমরা অধৈর্য্য হবো, কেন হবো না? কিন্তু, সঠিকভাবে কাজ করবো, কাজে কোন অধৈর্য্যের চিহ্ন রাখবো না।” যা অরাজকতা হয়েছে গত ১৬ বছর, তা একমাসে ঠিক হওয়ার মতো না, একটু সময় দিন ওনাদের, হাতে হাত রেখে সংস্কার করুন এই জুলাই বিপ্লবের স্বাধীনতার মাহাত্ম্যকে মাথায় রেখে।
তথ্যসূত্র: মানবজমিন, প্রথম আলো, যমুনা টিভি।

Comments
Shakil
সঠিক কথা
মো ইসমাইল
সুন্দর
Jawwad
Shundor hoise🤍
Add a comment: