স্বপ্নবাজ আরিফের কি স্বপ্ন পূরণ হবে না?

ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
রবিবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৪


আরিফের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে একজন ভালো মানুষ হবেন। জীবন নির্বাহে একটা ভালো চাকুরিন মাধ্যমে দেশ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবেন । নিজের অস্বচ্ছল পরিবারকে সচ্ছল করার তাড়নাও তার স্বপ্নের অংশ। জুলাই আগস্টের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনের উপর পুলিশের চালানো অস্ত্রের একটি বুলেট তার নির্ভেজাল সেই স্বপ্ন তসনছ করে দিয়েছে।

স্বপ্ন ভঙ্গ হতভাগ্য তরুণের নাম আরিফ। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের শালিয়াবহ গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও আন্না খাতুনের দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে আরিফ। ধলাপাড়া কলেজ থেকে গত এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ (৪.০৮) পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।জুলাই বিপ্লবের আন্দোলনে অংশ নিয়ে আরিফ পিঠে পুলিশের বুলেটে গুরুতর আঘাতে আহত হয়ে এখন শয্যাশায়ী।

এক রকম স্থবির জীবনযাপন এখন তার।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,আরিফ তার দরিদ্র পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। এখন তার অবস্থায় পরিবার বেকায়দায়। নিজের চিকিৎসা ও সংসারের খরচের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে রীদিমত হিমসিম খেতে হচ্ছে। সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারা না পারা এখন অদৃষ্ট। ফলে অনিশ্চয়তার দুলাচালে আরিফের পরিবার। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেয়ার পর পুলিশের ছোঁড়া গুলি পিঠে বিদ্ধ হয় তার।


বুলেট বুকেরপাঁজর ভেদ করে বাম হাতের ডানা ছিদ্র করে বেরিয়ে যায়। খাদ্য নালীও ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার। সেদিন আরিফ ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু  ৫০দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে  তাকে।শেষ করে এখন বাড়ি ফিরেছেন। খাবার খাওয়ার পরেই পেটে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে হয় তাকে। এ ব্যথা প্রায় দুই ঘন্টা স্থায়ী হয়।

এখনও তিনি শঙ্কামুক্ত নন। আরিফ হোসেনের বাড়ি আরিফের বাবার মৃত্যুর পর তার মা অসুস্থ থাকার কারণে তাকে বিয়ে করতে হয়েছে। বিবাহিত জীবনে আরিফের স্ত্রীসহ দেড় মাসের একটি ফুটফুটে সন্তান রয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, একটি টিনের ঘরে আরিফের পরিবারের বসবাস। সাংবাদিক এসেছেন শুনে তিনি খুবই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। যদিও পুরো মুখে ছড়িয়ে রয়েছে বিষণ্নতার ছাপ। এদিকে মুর্হুুতের মধ্যে এলাকার লোকজন তার বাড়িতে এসে ভীড় জমাতে শুরু করে।

আন্দোলনের ঘটনার বর্ণনায় আরিফ হোসেন বলেন, শুরু থেকেই আমি ঘাটাইলে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেই। ১৯ জুলাই চাচাতো ভাই রায়হান সিঙ্গাপুর চলে যাবে বিধায় তাকে নিয়ে ঢাকায় এয়ারপোর্টে পোঁছে দেই। এরপর ঢাকায় থেকে যাই। পরের দিন বন্ধুদের সাথে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে অংশ নেই। সেদিন আমরা বিভিন্ন স্কুূল-কলেজের প্রায় ৬০


ছাত্র-ছাত্রী ছিলাম। আমরা যখন মিছিল শুরু করি তখন হঠাৎ পুলিশের তিনটি গাড়ি আসে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। আমাদের মিছিল লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে। হঠাৎ একটি গুলি আমার পিঠে বিদ্ধ হয়ে বুকের পাঁজর ভেদ করে হাতের ডানা ছিদ্র করে বেরিয়ে যায়। এর পর আমি আর কিছুই জানি না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ ৫০ দিন  চিকিৎসা শেষে  গত ৯ সেপ্টেম্বর বাড়ি ফিরি।

Advertisement

এখন বাড়ি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছি। ডাক্তার বলেছে, আরো তিন বছর চিকিৎসা করাতে হবে। আমি ১৪ আগস্ট থেকে ৯ ডাক্তার বলেছে, আরো তিন বছর চিকিৎসা করাতে হবে। আমি ১৪ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি খরচে চিকিৎসা সুবিধা পেয়েছি। সংসারের খরচ বহন করে পরিবারের পক্ষে আমার চিকিৎসা খরচ আর বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।

আরিফের মা আন্না খাতুন (৫০) জানান, গত ২০ জুলাই ঢাকার উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় বন্ধুদের সাথে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে আরিফ পুলিশের ছোঁড়া গুলি পিঠে বিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।তাকে সহপাঠীরা উদ্ধার করে প্রাথমিক অবস্থায় ১৩ নম্বরে উত্তরা স্পেশালিস্ট হাসপাতালে ভর্তি করে।

প্রথম দফায় অপারেশন শেষে আইসিইউতে রাখা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে পরের দিন আরিফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় দফায় অপারেশন করা হয়। তখন ডাক্তারা জানায়, গুলি লাগার কারণে আরিফের ফুসফুসের একো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ জন্য কিছু অংশ কেটে ফেলতে হয়।

আবার জটিলতা বাড়োর ফলে তৃতীয় দফায় অপারেশন করা হয়। তখন আমরা সবাই ভেবেছিলাম ও আর বাঁচবে না। সকলের দোয়ায় আল্লাহ ওকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এ জন্য আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া। তিনি আরও জানান, ঢাকায় চিকিৎসার সময়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

এ খরচ আমার পরিবারের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না। এ পরিস্থিতিতে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার কর্য করতে হয়েছে। এই ঋণ পরিশোধ করার দুঃশ্চিন্তা আরিফকে আরো রোগা করে তুলছে। তারপর আরিফের চিকিৎসা, ঔষধপত্র কেনা, সংসারের খরচ বহন করে আমি এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। বড় ছেলে আল-আমিন কে ঋণ করে সাত বছর আগে বিদেশে পাঠিয়েছি ভাগ্য বদলের আশায়।


সেখানে গিয়েও তেমন সুবিধা করতে পারেনি ও।এখনও ঋণের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এখন প্রতি মাসে যা টাকা দেয় তাতে আমাদের সংসার চলে না।আমাদের কোন আবাদি জমি নেই, সবই কিনে খেতে হয়। আরিফ সুস্থ হলে তিনি তার ছেলের জন্য সরকারের কাছে একটা চাকুরির দাবি করেছেন। আরিফের স্বজন শাহ আলম জানান, আরিফ এলাকায় খুবই বিনয়ী ও পরোপকারী বলে পরিচিত।

বর্তমানে কর্মক্ষমতা হারিয়ে আরিফের পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। বাবার মৃত্যুর পর ওর মা দীর্ঘ দিন অসুস্থ ছিল। ওর মায়ের দেখাশুনা ও সংসারের কথা ভেবে ২০২২ সালে এসএসসি পাস করার পর আরিফকে বিয়ে করতে হয়। তার ঘরে একটি মেয়ে রয়েছে।

তাদের খরচও চালাতে হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকার অনুদান ছাড়া ওরা আর কিছুই পায়নি।বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘাটাইলের অন্যতম সমন্বয়ক রাকিবুল হাসান রাকিব জানান, আরিফের চিকিৎসা বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে।


পুরোপুরি সুস্থ হতে এখন আরো অর্থের প্রয়োজন। পরিবারের পক্ষে এ অর্থের যোগান দেয়া খুবই কষ্টকর ব্যাপার। আমরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আরিফের বিষয়ে আবেদন পত্র জমা দিয়েছি। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে কেউ যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত তাহলে আরিফকে সুস্থ করতে অনেক সহজ হতো। স্বপ্ন পূরণের পথে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যেতে পারতো।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরিফা হক  জানান, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে আমরা তাদের সামন্য কিছু সহযোগিতা করতে সক্ষম হয়েছি। ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত থাকবে। তাছাড়া সরকারিভাবে ঘোষণা আছে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে আহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে দেয়া হবে।

Comments

No comments

Add a comment:

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন