সরিষার হলুদ ফুলে সেজেছে কুষ্টিয়ার গ্রাম অঞ্চলগুলোতে

কুষ্টিয়া গ্রাম অঞ্চলে আবাদ করা সরিষার ক্ষেতগুলো ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠজুড়ে যত দূর চোখ যায়, তত দূর দেখা যায় হলদে রঙের সরিষা ফুল। বিশাল এ মাঠ দূর থেকে দেখতে মনে হয় বিশাল আকৃতির হলুদ চাদর বিছানো।
বাংলা ভাষায় প্রচলিত একটি প্রবাদ হচ্ছে - চোখে সর্ষে ফুল দেখা। প্রবাদের এই চোখে সরষে ফুল কেউ দেখতে না চাইলেও শীতের সময় দিগন্তজোড়া সর্ষে ক্ষেতে হলদে সর্ষে ফুল দেখে মুগ্ধ হবেনা এমন মানুষ মেলা ভার। নিজ চোখে শীতের প্রকৃতিতে সরষে ক্ষেতে সরষে ফুল দেখার অভিজ্ঞতা যার হয়েছে, সেটি তার মানসপটে চিরস্থায়ী হয়ে রবে।
সরিষা একটি তৈলফসল অর্থাৎ তেল বীজ। সরিষা বর্ষজীবী উদ্ভিদ। এর আদি নিবাস আমাদের এশিয়াতেই। সরিষা দানা পিষে সরিষার তেল বের করা হয়। সরিষার দানা মশলা হিসেবে ব্যবহার হয়। সরিষা পাতা শাক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।
ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শীতকালীন রবি শস্য হিসেবে সরিষার চাষ করা হয়। সরিষা ফুলে স্ব-পরাগায়ন ঘটে থাকে। সরিষার গাছ দৈর্ঘ্যে ১ মিটার মত হয়, তবে রাই সরিষা ২ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে
শীতকালে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ হেক্টর জমিতে (২০২০) এর সরিষা আবাদ করা হয়। বিভিন্ন জাতের সরিষার বীজে প্রায় ৪০-৪৪% তেল থাকে। বাংলাদেশে সরিষার তেলের উৎপাদনের বাৎসরিক পরিমাণ প্রায় আড়াই লক্ষ টন (২০২০)। সরিষার খৈলে প্রায় ৪০% আমিষ থাকে। বাংলাদেশে ৩ প্রকার সরিষার চাষ করা হয় যথা মাঘী সরিষা, রাই সরিষা ও ধলি সরিষা।
মিরপুর ও ভেড়ামারা এলাকার ফসলি জমিতে এখন হলদে রঙের সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে। ওই এলাকার সরিষা চাষি তরিকুল ইসলাম, ফারুক মুন্সি ও জামাল জানান, এলাকার এই দুটি মাঠজুড়ে এখন সরিষার আবাদ। হলদে রঙের সমারোহে চোখজুড়িয়ে যায়।
তবে পুরোপুরি ফুল আসতে আরও সময় লাগবে। বিভিন্ন উপজেলায় জমির পর জমিতে সরিষার আবাদ দেখা গেছে। মাঠের পর মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের নয়নাভিরাম দৃশ্যে ভরে ওঠার পালা। ফুলে ফুলে মধু আহরণে ভিড়ছে মৌমাছি। ভালো ফলনের সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে। সবমিলিয়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখছেন সরিষা চাষিরা।
সাধারণত রবি মৌসুমে কার্তিকের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সরিষার বীজ বপনের সময়। শীতকালে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি সরিষা ফুলে ছেয়ে থাকে চারদিক। তবে কুষ্টিয়া গ্রাম এলাকাগুলোতে অগ্রীম জাতের সরিষা আবাদ করা হয়। এছাড়া যে জমিতে সরিষা আবাদের পর বোরো ধানের চাষ করা হবে সেসব জমিতে আগাম সরিষা চাষ করা হয়।
জেলার কুমারখালী, খোকসা, মিরপুর, ভেড়ামারা, দৌলতপুর, বিভিন্ন স্থানে এ মৌসুমে সরিষার আবাদ লক্ষ্য করা যায়। আমন ধান ঘরে তোলার পরই কৃষকরা ওই জমিতে সরিষা চাষ করেন। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠে সরিষার আবাদ নব্বই ভাগ শেষ হয়েছে কিছুদিন আগে। পুরোদমে ফুল ফুটতে শুরু করেছে।
বিভিন্ন এলাকায় সরিষাক্ষেতে গিয়ে দেখা যায়, সরিষা মাঠে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছে বিভিন্ন বয়সের নারী, পুরুষ, শিশুসহ বিনোদনপ্রেমীরা। হলুদ সরিষা ফুলের সাথে ছবি-সেলফি তুলছেন কেউ কেউ। তবে কিছুদিনের মধ্যেই ভিড় বাড়বে ছবি তুলতে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়বে এসব ছবি। ছবি, ভিডিও ধারণের জন্য এসেছেন এলাকার নয়ন নামের এক যুবক। তিনি জানান, এবার একটু আগে-ভাগে ছবি, ভিডিও সংগ্রহ করতে এসেছি। সত্যি এখানে এসে মন ভরে গেছে। মনজুড়ানো দৃশ্য। চারদিকে শুধু হলুদ আর হলুদ।
উপজেলার ছেঁউড়িয়া এলাকার আবু হাসান, ফজলুল হক, হানিফ মোল্লাসহ একাধিক কৃষক জানান, উপজেলার অধিকাংশ জমিতে সরিষা আবাদ শেষ হয়েছে প্রায় ১৫-২০ দিন আগে। আবার অনেকে মাসখানেক আগে শেষ করেছেন। আগাম চাষিদের জমিতে সরিষা গাছে ফুল এসেছে। তবে সব জমিতে পুরোপুরি ফুলে ফুলে ভরে উঠতে সময় লাগবে এক থেকে দেড় মাস।
খোকসা উপজেলার চকরিপুর এলাকার চাষি তোফাজ্জল হোসেন, রিয়াজ খান, তোতা মিয়াসহ অনেক কৃষকরা জানান, এ বছর সরিষাক্ষেতে ভালো ফলন হবে বলে আশাবাদী। এখন পর্যন্ত জমিতে কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। বরং গাছগুলো সুন্দর আর স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠেছে। তবে বেশিরভাগ জমিতে ফুল আসতে শুরু হয়েছে।

Comments
No comments
Add a comment: