মরতে বসেছে ধনাগোদা নদী, সাঁকো দিয়ে নদী পারাপার, কচুরিপানায় বন্ধ নৌ চলাচল

সফিকুল ইসলাম রানা।
সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার কালিরবাজার এলাকায় ধনাগোদা নদী এখন কার্যত অচল। কচুরিপানার ভয়াবহ জমাট, অবৈধ জাগ স্থাপন ও দখলদারিত্বের কারণে গত চার মাস ধরে এ নদীতে নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে রয়েছে। নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো, সেই সাঁকো দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।

কালিরবাজার নৌকা ঘাটসংলগ্ন ধনাগোদা নদীতে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সরেজমিনে দেখা গেছে, কচুরিপানায় পুরো নদী ঢেকে গেছে। নৌকা চালানোর মতো খোলা পানির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। একসময় যেখানে নিয়মিত লঞ্চ ও নৌযান চলত, সেখানে এখন মানুষ হাঁটছে কচুরিপানার উপর দিয়ে কিংবা বাঁশের সাঁকো ধরে।

এই নদীপথ দিয়েই মতলব উত্তরের ধনাগোদা তালতলী উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জের দাউদকান্দি উপজেলার মোল্লাকান্দি লালমিয়া পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা ও দাউদকান্দি, মতলব উত্তর, গজারিয়া তিন উপজেলার লোকজন নিয়মিত যাতায়াত করত। কিন্তু নদীতে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন দুই উপজেলার শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা মিলে নদীর দুই পাশে অর্ধেক অর্ধেক করে বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছে।

পাঁচ কিলোমিটার নদী অচল, বন্ধ ৮টি লঞ্চঘাট
শ্রী রায়েরচর ব্রিজ থেকে কালিরবাজার পর্যন্ত ধনাগোদা নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভয়াবহ কচুরিপানা জমাট বেঁধেছে। এই অংশে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে নৌ চলাচল।

একই সঙ্গে অচল হয়ে পড়েছে নদীপথের অন্তত ৮টি লঞ্চঘাট। ফলে মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ এবং পাশ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া ও দাউদকান্দি উপজেলার সঙ্গে নৌ যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

অবৈধ জাগ ও দখলদারিত্বে মরতে বসেছে নদী
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধনাগোদা নদীর দুই পাড়ে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে জাগ (মাছ ধরার ফাঁদ) বসানো হয়েছে। এর ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কচুরিপানা সরে যেতে না পেরে নদীতে জমাট বেঁধে নদীকে পরিণত করেছে সবুজ মরুভূমিতে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও নিয়মিত খননের অভাব। ফলে নদীটি দিন দিন ভরাট হয়ে আজ মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে।
Advertisement

ব্যবসা-বাণিজ্য ও নৌ যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র। এই নদীপথ দিয়েই ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য আনা নেওয়া হতো। কিন্তু দখল, দূষণ, অবৈধ জাগ ও কচুরিপানার আগ্রাসনে সেই নদী আজ শুধু স্মৃতির অংশ বাস্তবে পরিণত হয়েছে চলাচল অনুপযোগী এক মৃত জলধারায়।

সেই সাঁকো দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছে শিক্ষার্থীরা একদিকে নদীর বুকে কচুরিপানার সাগর, অন্যদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল।
মোল্লাকান্দি লালমিয়া পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, নৌকা না থাকায় প্রতিদিন স্কুলে যেতে আমাদের বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হতে হয়। বৃষ্টি বা ভোরে কুয়াশার সময় খুব ভয় লাগে। তবুও উপায় নেই।

কালিরবাজার এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেন, নদীটা আমাদের জীবনরেখা ছিল। এখন সেই নদী কচুরিপানার জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন যদি আগে ব্যবস্থা নিত, আজ শিক্ষার্থীদের বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হতে হতো না।
স্থানীয়রা দ্রুত ধনাগোদা নদী খনন, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ, কচুরিপানা পরিষ্কার এবং দখলমুক্ত করার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায় নদী বাঁচলে বাঁচবে জনপদ, নইলে ধনাগোদা হয়ে যাবে আরেকটি মৃত নদীর নাম।
মতলব উত্তর প্রেসক্লাবের সভাপতি বোরহান উদ্দিন ডালিম বলেন, ধনাগোদা নদী আজ অবহেলা আর দখলদারিত্বের শিকার হয়ে মরতে বসেছে। বছরের পর বছর ধরে আমরা শুধু আশ্বাসই শুনছি, কিন্তু বাস্তব কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখি না। অবৈধ জাগ, কচুরিপানার আগ্রাসন আর খননের অভাবে নদী আজ নৌপথ নয়, মানুষের দুর্ভোগের নাম। অবিলম্বে কচুরিপানা অপসারণ, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ ও নদী খননের কাজ শুরু না হলে কঠোর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হবো।


এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ নিয়ে আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, কচুরিপানা অপসারণ, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ এবং নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Comments

No comments

Add a comment:

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন