প্রতিবন্ধকতার কাছে বন্দী জীবন: নোয়াখালীর হাতিয়ায় অবহেলিত মা-ছেলের হৃদয়বিদারক গল্প

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মেঘনা নদীঘেঁষা চর ইশ্বর ইউনিয়নের রাজেরহাওলা গ্রামে যেন সময় থমকে আছে একটি পরিবারের জন্য।
মানসিক ভারসাম্যহীন মা মিনারা বেগম ও জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলে মোমিন উদ্দিন—এই দু’জনের জীবনে নেই স্বস্তি, নেই নিরাপত্তা, নেই ন্যূনতম মানবিক সহায়তা। দীর্ঘদিন ধরে তারা বেঁচে আছেন চরম অনিশ্চয়তা আর অবহেলার মধ্যে।গ্রামের ফসলি জমির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট টিনের জুপড়িই তাদের আশ্রয়। কিন্তু সেই ঘরও আর ঘর নেই—টিনের চাল ও বেড়া বহু আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি জমে যায়, আর শীত এলে কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে থাকে মা ও ছেলে। যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে জরাজীর্ণ ঘরটি। নেই শীত নিবারণের জন্য গরম কাপড়, নেই কাঁথা বা কম্বল। মানবেতর জীবন যাপন করলেও তাদের দিকে তাকানোর যেন কেউ নেই মোমিন উদ্দিনের বাবা ইব্রাহিমের মৃত্যু হয় মোমিনের জন্মের আগেই। তখন মিনারা বেগমের গর্ভে তিন মাসের সন্তান। জন্মের পর থেকেই মোমিন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী—সে কথা বলতে পারে না, নিজে হাঁটাচলা করতেও অক্ষম। স্বামীহারা মিনারা বেগম একা হাতে প্রতিবন্ধী সন্তানকে লালন-পালনের দুশ্চিন্তায় একপর্যায়ে নিজেও মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। সেই থেকে আজও স্বামীর ভিটেতেই ছেলেকে বুকে আগলে পড়ে আছেন তিনি। দিন যত যাচ্ছে, তাদের জীবন ততই সংকুচিত হয়ে আসছে।
খাবারের জন্যও নেই নিশ্চিত কোনো ব্যবস্থা। ঘরের পাশে থাকা পুকুরপাড়ে বা আশপাশের গাছ থেকে ফল মাটিতে পড়লে তাই-ই হয়ে ওঠে তাদের আহার। সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা, এনজিও বা সমাজের বিত্তবানদের নজর—কিছুই পড়েনি এই মা-ছেলের জীবনে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই কাটছে তাদের দুর্বিষহ দিন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, একসময় রেডক্রিসেন্ট থেকে একটি ঘর বরাদ্দের কথা থাকলেও পরে তা অন্য ব্যক্তির নামে চলে যায়। এলাকার বাসিন্দা তনয় দাস বলেন, “এদের অবস্থা বহুদিনের, কিন্তু কেউ স্থায়ীভাবে সাহায্য করেনি।” প্রতিবেশী মো. জামাল উদ্দিন জানান, “প্রচণ্ড শীতে এরা এভাবেই খোলা ঘরে পড়ে থাকে। এখানে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সাহায্য বা শীতবস্ত্র বিতরণ হয়নি।” আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. নুর হোসেন বলেন, “প্রায়ই দেখি নেতারা নামের তালিকা করে নিয়ে যায়, কিন্তু ত্রাণ এদের কপালে জোটে না।”
মিনারা বেগমের বোন নারগিস বেগম বলেন, “আমি মানুষের খেতে-খামারে কাজ করে কোনোমতে নিজের সংসার চালাই। মাঝেমধ্যে সামর্থ্য হলে বোন আর ভাগনেকে ভাত রান্না করে খাওয়াই। কিন্তু আমার বোনের জরুরি চিকিৎসা দরকার, সেটা করানোর মতো সামর্থ্য আমার নেই।” শীতের এই সময়ে গরম কাপড়, কাঁথা-কম্বল না থাকায় তাদের কষ্ট আরও বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন সিকদার জানান, সরকারের পক্ষ থেকে মা ও ছেলেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের প্রত্যাশা—সমাজের বিত্তবান ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে হয়তো একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে অবহেলিত এই পরিবারটি।মানবতার দৃষ্টিতে তাকালে স্পষ্ট হয়—হাতিয়ার এই মা ও ছেলের জীবন শুধু সহানুভূতি নয়, তাৎক্ষণিক কার্যকর সহায়তা দাবি করে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে তাদের জীবনে ন্যূনতম নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে।

Comments
No comments
Add a comment: