নৌকা বানিয়ে পরিশ্রম, কিন্তু নেই লাভ —সংসার চালাতেই হিমশিম মিস্ত্রিদের।

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার চরাঞ্চলগুলোতে বর্ষার পানি থইথই করছে। এই সময়ে নৌকার চাহিদা থাকে তুঙ্গে। চলাচল, মাছ ধরা ও মালামাল পরিবহনে নৌকাই হয়ে ওঠে প্রধান বাহন। তবে নৌকার পেছনে যে মানুষগুলো দিনরাত শ্রম দিয়ে যান—সেই মিস্ত্রিরা আজও অর্থনৈতিক কষ্টে দিন কাটান। নৌকা তৈরি করে তাঁরা জীবিকা নির্বাহ তো দূরের কথা, পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
মতলব উত্তরের বাংলাবাজার, সটাকী বাজার, আমিরাবাদসহ আশেপাশের এলাকাগুলোতে বর্ষা মৌসুমে নৌকা তৈরির ধুম পড়ে। নানা প্রকার কাঠ যেমন জারুল, রেইনট্রি, চাম্বল, কদম, আম গাছ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হয় ডিঙি ও ছোট-বড় আকারের নৌকা। তবে এই খাতে মজুরি বাড়েনি, বরং খরচ বেড়েছে বহুগুণ। কাঠ, যন্ত্রপাতি ও শ্রমের দাম বাড়লেও নৌকার দাম বাড়াতে পারেননি নির্মাতারা, ফলে পড়েছেন চরম বিপাকে।নৌকার চাহিদা থাকলেও এর পেছনের কারিগরদের অবস্থা করুণ। তাদের কষ্টের ফসল ভেসে বেড়ায় নদীতে, কিন্তু ঘরে জমে না সুখের হাসি। সময় এসেছে এই শিল্পকে বাঁচাতে সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়ার, নইলে হারিয়ে যাবে এক ঐতিহ্য আর বেকার হয়ে পড়বে বহু দক্ষ শ্রমিক।গালিমখা গ্রামের জয়নাল আবেদীন বলেন, ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি এই বাজারে নৌকা তৈরি হয়। কিন্তু যারা বানায়, তারা কষ্টে থাকে। লাভ করে না।নৌকা কিনতে আসা ক্রেতারাও জানালেন, এখানে দাম কিছুটা কম। যেমন আব্দুর রহমান, যিনি ছোট লক্ষ্মীপুর থেকে এসেছেন, বলেন, এই বাজারে নৌকার দাম কিছুটা সাশ্রয়ী, তাই এখান থেকেই কিনি।৩২ বছর ধরে নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িত বেনু চন্দ্র সূত্রধর বলেন, এই বছর ২০০টা নৌকা বানিয়েছি, কিন্তু আয় ঠিকমতো হচ্ছে না। মজুরি কম, খরচ বেশি। খুব কষ্ট করে সংসার চালাতে হচ্ছে। তাই ভাবছি এই পেশা ছেড়ে দেবো।৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা মরন চন্দ্র বলেন, ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি, কিন্তু আজও কোনো উন্নতি হয়নি।মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান নিয়ে সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। এই বয়সে আর নতুন কিছু শিখে করা সম্ভব না।সুখেন্দ্র চন্দ্র সূত্রধর বলেন, বুঝ হওয়ার পর থেকেই এই কাজ করছি, এখন বয়স হয়েছে।
শক্তিও নেই, আয়ও নেই মাহাজন মো. ছাদেক ভূঁইয়া জানান, বর্ষাকালে কিছু নৌকা বিক্রি হয় ঠিকই, তবে সারা বছরের হিসেবে লোকসানই গুনতে হয়। কাঠ ও উপকরণের দাম খুব বেড়েছে, কিন্তু নৌকার দাম বাড়ানো যায় না। ফলে মজুরদের মজুরি দেয়াও কঠিন হয়ে যায়।একটি নৌকা ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে এই টাকায় খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়। ফলে নৌকা নির্মাণে যারা সরাসরি যুক্ত, তারা রীতিমতো বাঁচার যুদ্ধ করছেন।এই শিল্পের দুরবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে মতলব উত্তর উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, নৌকা নির্মাণ একটি ঐতিহ্যবাহী ও কষ্টসাধ্য পেশা। আমরা স্থানীয় নৌকা নির্মাতাদের সমস্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং বাজার সম্প্রসারণের ব্যবস্থা থাকলে এ শিল্পে জড়িতরা আরও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন। উপজেলা প্রশাসন থেকে প্রয়োজনে সহযোগিতা দেওয়া হবে।তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলের নৌকা কেবল বাহন নয়, জীবিকার অংশ। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং মিস্ত্রিদের উৎসাহিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

Comments
No comments
Add a comment: