নীল পর্দার ওপারে

নীল পর্দার ওপারে
স্বর্ণার জীবনটা বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ।
একটা সংসার, নিয়মিত দিনযাপন, সন্তানের স্কুল, বাজারের তালিকা, উৎসবের ছবি।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলো সবসময় বাইরে দেখা যায় না।
কিছু ক্ষত থাকে—কথা না বলার ক্লান্তিতে।
ফেসবুকের নীল পর্দায় সেদিন স্বর্ণা হঠাৎই একটা নোটিফিকেশন পেল।
সৃজিত।
একজন পরিচিত–অপরিচিত মানুষ।
একটা সাধারণ “ভালো আছো?”
এইটুকুই।
স্বর্ণা তখন জানত না, এই প্রশ্নটা তার জীবনের মানচিত্র বদলে দেবে।
সৃজিতও জানত না।
তার জীবনেও ছিল সবকিছু—স্ত্রী, সন্তান, দায়িত্ব।
কিন্তু কোথাও যেন সে নিজে হারিয়ে গিয়েছিল।
দিন শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে ভাবত—
“আমি কি শুধু দায়িত্ব পালন করার জন্যই আছি?”
স্বর্ণার সঙ্গে কথাগুলো প্রথমে খুব নিরাপদ ছিল।
সংসার, কাজ, সময়—
কোনো সীমা লঙ্ঘন হয়নি।
কিন্তু ধীরে ধীরে কথা বদলে গেল।
কথার ভেতর ঢুকে পড়ল অনুভূতি।
আর অনুভূতির ভেতর ঢুকে পড়ল আশ্রয়।
স্বর্ণা এমনভাবে কথা বলত,
যেন কেউ সত্যি সত্যি শুনছে।
সৃজিত এমনভাবে উত্তর দিত,
যেন কেউ তাকে বুঝছে।
ভালোলাগা কখন যে ভালবাসা হয়ে গেল,
তারা নিজেরাও টের পায়নি।
দিন নেই, রাত নেই।
ঘড়ির কাঁটা থামেনি,
কিন্তু সময় যেন তাদের জন্য অন্যভাবে চলতে শুরু করল।
এই সময়টায়,
স্বর্ণার স্বামী ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল।
তিনি প্রশ্ন করতেন না।
কারণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সাহস তার ছিল না।
তিনি শুধু দেখতেন—
একটা মানুষ তার পাশেই বসে আছে,
কিন্তু কোথাও নেই।
সৃজিতের স্ত্রীর চোখে তখনো বিশ্বাস ছিল।
বিশ্বাস ভাঙার শব্দ হয় না—
সে আসে নিঃশব্দে।
একদিন হঠাৎ সে বুঝল,
ভালো মানুষ হওয়া মানেই
ভালো স্বামী থাকা নয়।
আর শিশুরা—
তারা কিছু বোঝে না বলে আমরা ভাবি।
কিন্তু তারা সব অনুভব করে।
ভাঙা ঘরের শব্দ,
নীরব কান্না,
অপ্রয়োজনীয় চুপচাপ থাকা—
সবকিছু।
স্বর্ণা আর সৃজিত তখন অন্য জগতে।
তাদের প্রেম ঈর্ষান্বিত।
এই প্রেম পুরো মানুষটাকে চায়।
সময়, মন, অনুভূতি—সব।
এই বয়সের প্রেম আলাদা।
এখানে আর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নেই।
আছে বর্তমানটাকে আঁকড়ে ধরার মরিয়া চেষ্টা।
কারণ তারা জানে—
এটাই হয়তো শেষ সুযোগ
নিজের মতো করে বাঁচার।
শেষ পর্যন্ত,
দুটো পরিবার ভেঙে যায়।
ভাঙনের শব্দ খুব বড় হয় না।
কিন্তু তার ধ্বংস গভীর।
আর স্বর্ণা আর সৃজিত?
তারা একসাথে থাকে।
তারা বলে—
“আমাদের প্রেম অমর।”
হয়তো সত্যি।
হয়তো তাদের প্রেম শত বছরে একবার আসে।
যে প্রেমের জন্য মানুষ সব ত্যাগ করতে পারে।
কিন্তু যাদের ত্যাগের তালিকায় রাখা হয়নি—
স্বামী, স্ত্রী, সন্তান—
তারা বেঁচে থাকে
একটা দীর্ঘ প্রশ্ন নিয়ে।
প্রেম কি শুধু অনুভূতির নাম?
নাকি দায় এড়িয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর অজুহাত?
নীল পর্দার ওপারে জন্ম নেওয়া এই প্রেম
নিজেদের গল্প লিখে নেয়।
কিন্তু তার ফাঁকে ফাঁকে
অনেক মানুষের জীবন
নীরবে ছিঁড়ে যায়।
এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য—
সব প্রেম গল্প হয়,
কিন্তু সব গল্প রূপকথা হয় না।

Comments
No comments
Add a comment: