ডামুড্যায় কৃষি জমিতে মাছের খামার, বিপাকে চাষিরা

শরীয়তপুর ডামুড্যা উপজেলায় বিগত বছরের ন্যায় আবারো শুরু হয়েছে অপরিকল্পিত পুকুরখনন। তবে পুকুরখনন সিন্ডিকেটের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবেই ম্যানেজের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে এই খননযজ্ঞ।
শুক্রবার (৬ জানুআরি) সকালে উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা ইউনিয়ন ২নং ওয়ার্ডে প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমানের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায় তিন ফসলি জমিতে শুরু হয়েছে মাটি বিক্রির জন্য পুকুরখনন। চোর-পুলিশ খেলায় বিভিন্ন কারণে হেরে যাচ্ছে পুলিশসহ উপজেলা প্রশাসন। এতে পুকুর খনন বন্ধে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে আবেদন দিয়েও ফলাফল শূণ্যই থেকে যাচ্ছে। প্রেক্ষিতে একদিকে আবেদনকারিরা পড়ছে বিপাকে এবং অন্যদিকে খননকারিরা হচ্ছে উৎসাহিত। এতে জেলায় কমেছে খাদ্য উৎপাদন, হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ। গত পাঁচ বছরে বাণিজ্যিক মাছের খামার বেড়েছে বহুগুণ। কমেছে চারণভূমি, সংকট বেড়েছে পশু খাদ্যের। মাছের খামার করার কারণে গত দুই বছরে ধানের জমি কমেছে সাড়ে তিন হাজার একরের বেশি। ধানের উৎপাদনও কমেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রথমে কিছু জমিতে খামার করে পরে পাশের জমিও খামারের জন্য ভাড়া দিতে কৃষকদের বাধ্য করছেন। জমির উপযুক্ত ভাড়া না পাওয়ায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ডামুড্যা উপজেলায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪ হাজার ৩২০ একর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে ৩ হাজার ৮৪০ একরে নেমে এসেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৮০ একর। উৎপাদন কমেছে ৪ হাজার ৩৯১ মেট্রিক টন ধান।
কৃষকেরা জানান, ধানের দাম কম থাকায় অনেক জমির মালিক এক ফসলি জমি মৎস্য খামারিদের কাছে ভাড়া দেন। মৎস্য খামারিরা একসঙ্গে ১৫ থেকে ২০ একর জমি নিয়ে একেকটি মৎস্য খামার তৈরি করেন। সেখানে অনেক ক্ষুদ্র কৃষকের জমিও থাকে। ওই কৃষকদের তখন বাধ্য হয়ে খামারিদের কাছে ধান উৎপাদনের জমি ছেড়ে দিতে হয়। কৃষকেরা প্রতি শতাংশ জমি বছরে ভাড়া পান ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা ইউনিয়নের ঘোরাল কান্দি সাড়ে ৪ একর জমিতে স্থানীয় কৃষকেরা ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
২নং ওয়ার্ডের প্রভাবশালী উজ্জল মেম্বার ও হোসেন মিয়া কিছু কৃষকদের কাছ থেকে ভাড়া নেন। বাকি এলাকার ৩৩ জন কৃষক তাঁদের ৮০ একর জমি মৎস্য খামার করার জন্য ভাড়া দেননি।
ঘোরাল কান্দি গ্রামের বকুল বলেন, আমরা গরিব মানুষ। ওই জমিটুকুই আমার পরিবারের শেষ সম্বল। উজ্জল মেম্বার ও হোসেন দখল করে মাছের খামার বানাচ্ছেন। কে আমার জমিটি উদ্ধার করে দেবে? এ জমিটি হাতছাড়া হয়ে গেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পথে পথে ঘুরতে হবে। জমিতে ধান উৎপাদন না করতে পারলে মাছ দিয়ে কী করব? ভাত ছাড়া শুধু মাছ খেয়ে তো বাঁচতে পারব না।
অভিযোগ প্রসঙ্গে হোসের কাছে জানতে গেলে তিনি বলেন,শরীয়তপুর -৩ আসনের এমপি নাহিম রাজ্জাক কৃষি জমি কেটে মাছের খামার করার অনুমতি দিয়েছে।
এ ব্যপারে অভিযুক্ত উজ্জল মেম্বারের কাছে জানতে গেলে তিনি টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার চেস্টা করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রেণি পরিবর্তন করে আবাদযোগ্য জমিতে পুকুর খননের সুযোগ নেই আইনে। তারপরও এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি নানান কৌশলে পুকুর খনন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিল ও নিচু এলাকাগুলোকে অনাবাদি কিংবা এক ফসলি দেখিয়ে পুকুর খনন করছেন তারা।
শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রণব কুমার কর্মকার বলেন, গত কয়েক বছরে শরীয়তপুরে প্রায় দ্বিগুণ মাছ উৎপাদন বেড়েছে। গত ১০ বছরের মধ্যে পুকুরও বেড়েছে কয়েক গুণ। মাছ চাষ করে অনেক বেকার যুবক স্বাবলম্বী হচ্ছেন। মাছ চাষের জন্য চাষিদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ফলে জেলায় মাছ এখন উদ্বৃত্ত থাকছে। যা দেশের বিভিন্ন জেলা এবং দেশের বাইরে রফতানি করে বিপুল অর্থ আয় হচ্ছে।
ডামুড্যা উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণের উপসহকারি বলেন, সহজ-সরল কৃষকেরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে মৎস্য খামারিদের কাছে জমি ভাড়া দিচ্ছেন। কৃষক যদি নিজে মাছের খামার করতেন, তাহলে সমস্যা হতো না। বরং লাভবানই বেশি হতেন। কিন্তু কিছু ব্যক্তি জমি ভাড়া নিয়ে মাছের খামার করছেন।
ডামুড্যা উপজেলা নিবার্হী অফিসান হাছিবা খান বলেন,কৃষি জমি কাটার বিষটি আমার জানা নেই। কৃষকদেরকে আমার কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন? তারা যদি লিখিত অভিযোগ দেন যে এখানে কৃষি জমি খনন করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে আইনভঙ্গ করা হচ্ছে। তখন তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Comments
No comments
Add a comment: