গণিতের উৎসবে উদ্বেলিত শিক্ষার্থীরা- ফেনীতে আঞ্চলিক গণিত উৎসব অনুষ্ঠিত

‘সংখ্যা, অংক ও গণিতের মধ্যে পার্থক্য কি?’ এ প্রশ্ন জান্নাতুল নাইম নামের এক শিক্ষার্থীর। শনিবার ফেনী সরকারি কলেজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত গণিত উৎসবে যোগ দিয়ে এই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ওই ছাত্রী। এমন আরও মজার শতাধিক প্রশ্ন উঠে আসে এ উৎসবের প্রশ্নোত্তর পর্বে।
‘গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো’স্লোগানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় ফেনীতে আঞ্চলিক গণিত উৎসবের এ আয়োজন করে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি। ফেনী সরকারি কলেজের মাঠে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক গণিত উৎসবে ফেনী,নোয়াখালী,লক্ষ্মীপুর ও পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে চারশ শিক্ষার্থী অংশ নেয় প্রাইমারি, জুনিয়র, সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি-এই চার ক্যাটাগরিতে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া ৩০জন শিক্ষার্থীকে টিশার্ট, সনদ ও পদক দেওয়া হয়।
সকাল ১০টার দিকে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে উৎসব শুরু হয়। উৎসবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন ফেনী সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ দেলওয়ার হোসেন ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( শিক্ষা, উন্নয়ন, আইসিটি) ফাহমিদা হক, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধি আবু তাহের।

আয়োজনে সহযোগিতা করেছে প্রথম আলো ফেনী বন্ধুসভা। উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন বলেন,গণিতের মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। মানসিক দক্ষতার জন্য সর্বক্ষেত্রে প্রয়োজন গনিত। আঞ্চলিক গণিত উৎসবে যাঁরা অংশগ্রহণের মাধমে তাঁদের গণিত চর্চার বিকাশ ঘটবে, তাঁদের মেধার বিকাশ ঘটবে। ভবিষ্যতে তাঁরা এই গণিত চর্চা, যুক্তি, বুদ্ধি ও চিন্তার মাধ্যমে সুন্দর এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়বে। তিনি বলেন, ‘গণিতের ভয় দূর করতে হবে। গণিত মজার। আনন্দ নিয়ে গণিতের চর্চা করতে হবে।’
উদ্বোধনের পর সকাল ১০টা ১৫ মিনিট থেকে কলেজের বিভিন্ন কক্ষে গণিতের পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষার পর বন্ধুসভার সদস্যদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর ছিল শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব। এ পর্বে শিক্ষার্থীরা একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেন আলোচকদের। গণিত নিয়ে শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আলী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন, সহযোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, ফেনী সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো.আফতাব উদ্দিন, সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ জহির উদ্দিন, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জয়শ্রী দাস, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো.মিনহাজ হোসাইন,প্রভাষক রাজিব কর্মকার, ফেনী সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মোশারফ হোসেন,আহম্মদ আলী, প্রভাষক মো.দিদোয়ানুল কবির। সঙ্গে ছিলেন জয়নাল হাজারী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবদুল হালিম।

বক্তব্য দেন ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি তোফায়েল আহমেদ তপু। লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র মুজাহিদুল ইসলাম প্রশ্ন করে আমরা কার্বন ডাই-অক্সাইড অক্সাইড ত্যাগ করি,অক্সিজেন গ্রহন করি। তাহলে এতো কার্বন ডাই-অক্সাইড কি ভাবে আসে? একই সঙ্গে ঋণাত্মক সংখ্যার লগ হয় না কেন? ঋণাত্মক সংখ্যা কী মৌলিক সংখ্যা হবে? গণিত উৎসবে শিক্ষার্থীরা যেমন এসেছিল, তেমনি এসেছিলেন অভিভাবকেরাও। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই কলেজ প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের পদচারণে। উৎসবে কিশোর আলো, গণিত অলিম্পিয়াড বইয়ের স্টলও বসে। সেসব স্টল ঘুরে দেখেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
সমাপনী বক্তব্যে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আলী বলেন,প্রশ্নে প্রশ্নে জমজমাট গনিত উৎসব। তিনি বেশ কয়েকবার গণিত উৎসবে ছিলাম। কিন্তু এত সুন্দর ও কঠিন প্রশ্ন কখনো পাইনি। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, গনিত একটি সহজ বিষয়। গনিত চর্চার মাধ্যমে এ অঞ্চল থেকে ভালো মানের গণিতবিদ পাওয়া যাবে। গণিত ভীতি দূর করার বড় উদ্যোগ গণিত উৎসব। গণিত হলো সভ্যতার প্রবেশদ্বার। গণিত চর্চার মাধ্যমে চিন্তার জগৎকে শাণিত করতে হবে। গনিতকে ভয় নয়। জয় করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
খাগড়াছড়ি ক্যান্টমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র ঋদ্দিমান চাকমা জানায়,গনিত উৎসবে অংশ নিতে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভোর পাঁচটায় খাগড়াছড়ি থেকে ভাড়ায় চালিত গাড়ি যোগে রওনা দিয়ে সকাল সাড়ে আটটায় ফেনী সরকারি কলেজে এসে উপস্থিত হয়েছে। গনিতকে ভালোবাসি বলে তীব্র শীতে ভোরে ভোরে অনেক দূর থেকে উৎসবে এসেও মজা লাগছে।

Comments
No comments
Add a comment: