কেশবপুর উপজেলায় স্থায়ী জলাবদ্ধতায় সংকটে পড়েছে ১২টি গ্রামের হাজারো মানুষ

কেশবপুর উপজেলায় স্থায়ী জলাবদ্ধতায় সংকটে পড়েছে ১২টি গ্রামের হাজারো মানুষ। স্থায়ী জলাবদ্ধতা এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি পরিণত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটে। উপজেলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়নের অন্তত ১২টি গ্রামের হাজারো মানুষ গত সাত মাস ধরে পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শ্রী নদীর নাব্যতা সংকট, সংযোগ খাল ভরাট এবং অপরিকল্পিত মাছের ঘেরের বেড়িবাঁধে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঁজিয়া, সুফলাকাটি ও গৌরীঘোনা ইউনিয়নের বাগডাঙা, মনোহরনগর, নারায়ণপুর, কালীচরণপুর, আড়ুয়া, সানতলাসহ ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোতে এখনও অধিকাংশ বাড়ির উঠান, রান্নাঘর ও গোয়ালঘরে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও ঘরের ভেতরেই পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে, সম্পূর্ণ ব্যাহত হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
বর্তমানে কয়েকশ সেচ পাম্প বসিয়ে পানি সরানোর চেষ্টা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বর্ষা মৌসুম শেষে পানি নামার কথা থাকলেও এবছর আশ্বিন-কার্তিকে সামান্য পানি কমলেও ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে আবার নতুন করে পানি বাড়তে শুরু করেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় এই এলাকার ২৭টি বিলের পানি ডায়ের খাল হয়ে শ্রী নদীতে গিয়ে পড়তো। কিন্তু প্রায় দুই দশক আগে এলাকার প্রভাবশালী একটি মহল নদীর মোহনা ও খালের মুখে অবৈধভাবে বাঁধ, কালভার্ট ও সুইস গেট নির্মাণ করে মাছের ঘের স্থাপন করে। এতে করে নদী ও খালের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে শ্রী নদী নাব্যতা হারিয়ে ফেলে এবং পানি নিষ্কাশনের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়।
জলাবদ্ধ এলাকার মানুষজন এখন কার্যত এক 'ভাসমান জনপদে' বসবাস করছেন। গ্রাম থেকে গ্রামে চলাচলের একমাত্র ভরসা বাঁশের সাঁকো ও ডিঙি নৌকা। কোথাও কোথাও শত শত ফুট দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো তৈরি করে মানুষ যাতায়াত করছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। বর্ষায় কিংবা রাতে এই সাঁকো দিয়ে চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বাগডাঙা গ্রামের বাসিন্দা অজিত মন্ডল বলেন, সাত মাস ধরে পানির মধ্যেই দিন কাটছে। গরু-ছাগল রাখার জায়গা নেই, রান্না করাও কষ্টকর। আগে জানতাম বর্ষায় পানি বাড়ে, এখন শীতেও পানি বাড়ছে।
দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত। বাড়ির আঙিনায় পানি থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না। কোথাও কোথাও পরীক্ষাও দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে বদ্ধ পানিতে বসবাসের কারণে পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ ও ডেঙর ঝুঁকি বেড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন। চিকিৎসার জন্য উপজেলা সদরে পৌঁছাতেও মানুষকে নৌকা ও সাঁকোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে কৃষি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে এই এলাকার অধিকাংশ জমিতে ফসল ফলানো যাচ্ছে না। কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো দিন দিন নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। অনেক জেলে ও কৃষক বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কেশবপুরের উপসহকারী প্রকৌশলী ফিরোজ আহমেদ জানান, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে শ্রী নদীসহ কয়েকটি নদী ও খালের খনন কাজ চলমান রয়েছে। খনন শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ২৭ বিল বাঁচাও আন্দোলন কমিটি'র আহ্বায়ক বাবর আলী গোলদার বলেন, নদী খনন সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান নয়। শ্রী নদী ও সংযোগ খালগুলোতে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) চালু না করলে এবং অবৈধ ঘেরের বাঁধ অপসারণ না করলে এই জনপদের মুক্তি মিলবে না।

Comments
No comments
Add a comment: