শিক্ষকতা থেকে রাজনীতির শীর্ষে, মির্জা ফখরুলের জীবনপথ

ঠাকুরগাঁওয়ের শান্ত জনপদ থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ধৈর্য, সংযম ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার রাজনৈতিক পথচলা।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের আন্দোলন এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক দর্শন গঠনে ভূমিকা রাখে। শিক্ষাজীবন শেষে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে ঢাকা কলেজে কর্মজীবন শুরু করলেও দীর্ঘদিন পেশাগত জীবনে স্থির থাকতে পারেননি। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। রাজনীতিতে ফিরে এসে ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এরপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তিনি কৃষি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে472;। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পান। সরকারে দায়িত্ব পালনের পর তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায় শুরু হয় ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে। ২০০৯ সালের পর বিএনপির রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হলে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দলের কাউন্সিলে তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব আরও বাড়ে।
একদিকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস, অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে বিএনপির রাজপথের নেতৃত্বে অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল। আন্দোলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, মামলা ও গ্রেপ্তারের মতো নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ সময় দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর থেকে দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
রাজনীতির বাইরে মির্জা ফখরুল অর্থনীতি ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী বলেও পরিচিত। তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি সংবেদনশীল ও মানবিক দিকও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন মহলে তার ব্যক্তিত্ব ও আচরণ নিয়ে শ্রদ্ধার কথা শোনা যায়।
ঠাকুরগাঁওয়ের একজন শিক্ষক থেকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছানোর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পথচলা তাই দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ধৈর্য ও প্রতিকূলতার মধ্যেও অবস্থান ধরে রাখার এক অধ্যায়।

Comments
No comments
Add a comment: