ডালিয়া আফরোজ ডালুর সপ্ন ছিল একদিন সে আকাশ ছোবে

জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী
শুক্রবার, ১৫ মার্চ ২০২৪


ডালিয়া আফরোজ ডালু। পেশায় একজন চাকুরীজীবি। আমার ছোট ছেলে আলী সাইহানকে নিয়ে আমার এ লেখা। ১৩ বছর পেরিয়ে ১৪ তে পা রাখলো সে। মূল্যায়নে সে একজন বিশেষ শিশু। ২০১১ সালের ১৫ জানুয়ারী থেকে ওকে নিয়ে আমার এই নতুন পথ চলা।

লিখতে বা বলতে গেলে সবটুকু কভার করবে না। হয়ত আমার যুদ্ধের সবটুকু সবাই বুঝতেও পারবেনা। সাইহানের ১মাস বয়স থেকেই আমি অল্প অল্প বুঝতে পেরেছিলাম ও অন্য বাচ্চাদের মতন না। আমার বড় ছেলের কোন আচরন ই ওর মধ্যে টের পাই নি। আর তখন থেকেই আমার ওকে নিয়ে অন্য রকম পথচলা।১মাস বয়স থেকেই আমি ওকে ডাক্তার দেখানো শুরু করি এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়। চার মাস বয়স থেকেই দেশের ডাক্তারেরা কোন কিছুই Identify করতে পারে নি। ডাক্তারদের বলা মুশকিল বাক্যে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হলো দেশের বাহিরে নেবার। তখন আমার রোজগার ও খুব বেশি ছিল তা না।কিন্তু আমার আগ্রহ ও মনোবল কোন কার্পণ্য করে নি। যেহেতু ওর Problem টা দেশের কোন ডাক্তার ধরতে পারে নি, তাই ওকে সিংগাপুর এ মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ওখানে MRI সহ কিছু টেস্ট করে বুঝতে পারলাম অনেক ব্যয়বহুল।



তাই National University Hospital, Singapore এ দেখানো শুরু করলাম। ওখানে ENT, EYE Specialist, Neurologist দেখানো হলো এবং ওর এসব সমস্যা গুলো আমিই বুঝতে পেরে ডাক্তার দেখানো শুরু করি। আমার পাঁচ মাসের বাচ্চাকে MRI করানো হলো পুরোপুরি অজ্ঞান করে। কানের টেস্ট করানো হলো অজ্ঞান করে। এটা তখনকার জন্য আমার কাছে ছিল এক চরম মর্মান্তিক সময়। একটা পাঁচ মাসের বাচ্চার শরীরের উপর দিয়ে কি গিয়েছে তা আমি মা হয়ে সামনে বসে দেখেছি। অজ্ঞান করার পর যখন ওর হুশ আসছিলো না তখন আমার এক কঠিন অপেক্ষা ছিল।ওর শরীর থেকে ভেইন চিকন হওয়াতে হাত পা মোচড়ায় মোচড়ায় কাপড় নিংড়ানোর মতন করে রক্ত নেওয়া হত পরীক্ষা করানোর জন্য৷ ও ছটফট করতো আমি এক কঠিন মা ওর গা এর উপরে উঠে ওকে চেঁপে ধরতাম। মাঝে মাঝে এভাবেও সম্ভব হতো না। তখন ওকে OT তে নিয়ে হাত বা পা এর ভেইন কেটে রক্ত নেওয়া হত। একটা রক্ত পরীক্ষার জন্য ওর শরীরে বার বার সুঁই ফুড়ানো হতো। সেই কঠিন দৃশ্য জানিনা কতজন নিতে পারবে। কিন্তু আমি মায়া কে চাপা দিয়ে প্র‍য়োজনীয়তা কে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছি।



আমার কাছে তখন মনে হত এটা ওর বেঁচে থাকার লড়াই। আর এই লড়াই এ তো আমাকে কঠিন থাকতেই হবে। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে Identify হলো সাইহান CLS Term এর অন্তর্ভুক্ত বাচ্চা। CLS (Coffin Lowry Syndrome)। আমি জানিনা হয়ত কারো কোন উপকারে লাগতে পারে। তাই বলবো কারো Interest বা Need থাকলে CLS দিয়ে Internet এ Search দিয়ে দেখবেন। এই গ্রুপের বাচ্চারা Multi Problem নিয়ে বেঁচে থাকে। আমার সাইহান ও তার ব্যতিক্রম না। ওর দাঁতে সমস্যা ছিল, ওর কানে সমস্যা, ওর হার্টে সমস্যা, ওর মেরুদণ্ডে সমস্যা। আরো খুঁটি নাটি অনেক সমস্যার মধ্যে দিয়ে ও বেঁচে আছে।২০১৫ তে ওর হার্ট এর অপারেশন হয়, ২০১৬ তে ওর কানের অপারেশন হয় এবং ২০২৩ সালে ওর Full Back Bone Operation হয়। এখনো ও কানের মেশিন ছাড়া শুনতে পায় না। একদমই কথা বলতে পারে না৷ গত ২০২৩ এ মেরুদণ্ড অপারেশন এর আগে ওর Scoliosis Problem এর জন্য প্রায় ও Paralysis হয়ে যায়। Operation এর পর ও এখন হাটতে পারে। প্রতিবার অপারেশন এর আগে ওকে OT তে অজ্ঞান করানো হয়েছে আমার কোলের উপর। অজ্ঞানের পর পর OT ছেড়ে যখন আমি বের হয়ে আসতাম তখন মনে হতো এ পৃথিবীতে এমন নির্দয় মা আর কেউ নেই। একটা লাশের মতন ওকে ঘুম পাড়িয়ে চলে আসতাম। ভীষণ কঠিন সেই দৃশ্য!



Advertisement
সাইহানের সমস্যা বুঝতে পারার পর পর আমার মনে হতো আমার মতন দুঃখী মা বোধহয় এ জগতে আর কেউ নাই। তাই বলে আমি থেমে থাকি নি। দেশে বিদেশে যেখানে ওর জন্য ভাল কিছু হবে জেনেছি, ওকে নিয়ে ছুঁটে গিয়েছি। আর আমার মতন অনেক মা কে দেখেছি তাদের সমস্যাযুক্ত বাচ্চা সহ। মনোবল আমার আরো বাড়তে লাগলো। আর আমি আলহামদুলিল্লাহ বলতাম। সাইহানের ক্ষেত্রে আমার শক্তি ছিল ওর থেকে বেশি অসুস্থ বাচ্চাদের কে দেখে শুকরিয়া করা। আমি ভাল আছি, আমার সাইহান তো ভালো আছে ওদের থেকে। এটাই আমার শক্তি।কখনো পিছ পা হইনি। হাজার প্রতিবন্ধকতা আর বাঁধার সম্মুখীন হয়েও আমি সামনে চলেছি নিজের শক্তিতে। আমি অনেকের থেকে অনেক ভাগ্যবতী মা। আমার চেষ্টা, শ্রম, আত্মবিশ্বাস আজকের সাইহান। যে কিনা শোয়া থেকে উঠে বসতে পারবেনা বলেছে কতজন।কারো নেগেটিভ কথা আমি কোনদিন কানে নেই নি। কারো অপবাদ বা কটুক্তি আমাকে দূর্বল করেনি। আমি জানি আমার সন্তানের জন্য কোনটা ভাল। আর অন্য কারো সহযোগিতা ছাড়াই ওকে এত দূর নিয়ে এসেছি। মাথা উঁচু করে বলতে পারি আমার সাইহানের জন্য যতটুকু করেছি তা সম্পূর্ণ টুকুই আমার। সন্তান জন্ম দেবার আগ থেকেই



সন্তান জন্ম দেবার আগ থেকেইমায়েদের অনেক দায়িত্ব শুরু হয়। আমি সাইহানের জন্য পেট থেকে সেই দায়িত্ব পালন করে এসেছি। এতটুকু কার্পণ্য বা অবহেলা আমার সন্তানদের নিতে হয় নি। ওদের মা একাই ওদের জন্য ১০০। আমার সামর্থের থেকেও আমার মানসিক শক্তি অনেক বেশি। আর তার জোরেই আজ আমি আমার সাইহান কে হাটা চলা করাতে পারছি।২০১৭ সাল থেকে আমার ছেলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের প্রয়াস স্কুলে যায়। স্কুল তার ভীষণ প্রিয় একটা জায়গা। আমার হাজার কাজের ব্যস্ততায় আমি ওকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ রাখিনি ( যদি না ওর শরীর খারাপ থাকতো)। আমাদের সমাজে অনেক শিক্ষিত অশিক্ষিত মানুষ আছে যারা এমন বাচ্চা জন্ম দেওয়া মায়েদেরকে নানান রকম কথা শোনায়,অপবাদ দেয়।যা হয় অনেক অসহনীয়। কিন্তু আমি বলবো তারা আসলে ওই বিশেষ শিশু থেকেও বেশি অসুস্থ। আর তাদেরকেই আসলে চিকিৎসা করানো দরকার। আমরা সবাই একটা বিশেষ শিশু কে প্রতিবন্ধী বলি। যদিও এটাই বই পুস্তকে আখ্যায়িত। কিন্তু আমার মনে হয় একটা বিশেষ শিশু কে বিশেষ না বলে প্রতিবন্ধী বলে তাকে কি ছোট করা হয় না? বরং বিশেষ শিশু বলে তাকে মূল্যায়ন করাটা তার জন্য যথাযথ। আমরা Special সব কিছুর প্রতি একটু আলাদা যত্নশীল হই। তাহলে সব বিশেষ শিশু দের অভিভাবক এবং আশে পাশের সবার তাদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া উচিৎ।


বিশেষ " সম্মোধন টা তাদের জন্য একটা সম্মান জনক সম্মোধন। অনেক মা বাবা এমন সন্তান জন্মানোর পর হতাশ হয়ে যান। নিজেদের অপরাধী মনে করেন, অবহেলায় ফেলে রাখেন এমন বাচ্চাদের কে। বাসা থেকে কোথাও নিতে চান না, স্কুলে দিতে চান না, চিকিৎসা করান না। আমি নিজে আমার পরিচিতদের দেখেছি। যারা সুস্থ বাচ্চাদের জন্য সব করেন। কিন্ত এমন বিশেষ বাচ্চাকে ঘরে বন্দি করে রেখেছেন। টাকা খরচ হবে বলে চিকিৎসা করান নি। অথচ তাদের টাকা পয়সার অভাব নেই। আপনার কাছে ও আসা মানেই আপনি ওর জন্য উপযুক্ত। আর আপনার অনিচ্ছা ও অবহেলা ওর প্রাপ্য নয়। সমাজের লোক লজ্জার ভয় ওকে কোথাও নিয়ে না যাওয়া, ওর প্রাপ্য ওকে বুঝিয়ে না দেওয়া ওর Development এ কতখানি বাধাগ্রস্ত হয় তা কখনো ভেবেছেন? এমন,বাচ্চা জন্ম নেবার পর কত যে মানুষের সম্পর্ক ভেংগেছে! কত পরিবার যে এমন বাচ্চা কে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছে। কত নির্দয় বাবা দ্বায়িত্ব হীন হয়ে নিজের সুখ নিয়ে ভাবছে। কেবল মা ই একজন, যে সবকিছুর উর্ধে এবং বাচ্চাকে আগলে রাখে।



আমি আমার সাইহান কে আকাশ ছোঁয়াতে পারি নি। কিন্তু সে আমার চেষ্টায়, আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহোযোগিতায় এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সাইহান এখন অনেক কিছুই করতে পারে,যা অনেকের কাছে বিষ্ময়! ওকে আমরা সব জায়গাতে নিয়ে যাই যেখানে ওর যাবার Access নেই এবং ওকে যেখানে কেউ অবহেলা করে আমি তাদেরকে বয়কট করি। তাদেরকে আমি-ই অবহেলা করি। আমরা একসাথেই Dining Table এ খেতে বসি। আমাদের একসাথে খাওয়া,বেড়ানো ও ভীষণ উপভোগ করে। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি এবং করছি সাইহানের Development এর জন্য সব করতে। তারপরও মনে হয় যদি আরো বেশি কিছু করতে পারতাম তাহলে ওর Development টা আরো বেশি ভাল হতো। মায়ের মন বোধহয় এমনই হয়। সন্তানের মংগলের জন্য তার নিজের সর্বস্ব দিয়ে দিলেও মনে হয় কিছুই করতে পারি নি।

সাইহান আমার মহারাজ্যের এক হীরার টুকরো, আমাদের বাসার একটা প্রান, সারা বাসাময় একটা জীবন্ত খেলনা।

Comments

No comments

Add a comment:

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন