যেভাবে প্রথম শিকার ধরেন কুখ্যাত এপস্টেইন ও তার প্রেমিকা

অনলাইন ডেস্ক।
মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


মার্কিন বিচার বিভাগ ‘এপস্টাইন ফাইলস’ নামে পরিচিত বিপুলসংখ্যক নথি প্রকাশ করেছে।

এসব ফাইল জেফরি এপস্টেইনের যৌন নির্যাতন ও শিশু পাচারের অভিযোগের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত। ফাইলগুলোতে তার প্রেমিকা গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের ভূমিকাও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তরুণী ও কিশোরী মেয়েদের এপস্টেইনের যৌন নির্যাতনের জালে তিনিই টেনে আনতেন।মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ জানিয়েছে, নথিগুলোর মধ্যে ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, ইমেইল, ডায়েরি এন্ট্রি, এফবিআই রিপোর্ট ও আদালতের কপি রয়েছে। এগুলোতে দেখা যায় কীভাবে গিলেইন ও এপস্টেইন মিলে একটি সুসংগঠিত গ্রুমিং প্রক্রিয়া পরিচালনা করতেন।

  ধারণা করা হয়, গিলেইন ও এপস্টেইন তাদের প্রথম শিকারটি করেছিলেন ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সে সময় মিশিগানের ইন্টারলোচেন স্কুল অব দ্য আর্টস-এর একটি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে এই জঘন্য চক্রের শুরু হয়। ১৩ বছর বয়সি এক কিশোরী, যাকে আদালতের নথিতে ‘জেন ডো’ বলা হয়েছে, সেখানে গানের প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ—থিয়েটার, নাচ, সৃজনশীল লেখালেখি ইত্যাদি শেখানো হত। জেন ডো ফ্লোরিডার পাম বিচ থেকে প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার দূরে অনুষ্ঠিত ওই ক্যাম্পে অংশ নিয়েছিলেন। 

জানা গেছে, মিশিগানের ওই গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে একদিন ক্লাসের ফাঁকে একটি পার্ক বেঞ্চে একা একা বসেছিলেন জেন ডো। এ সময়ই তার সামনে এসে দাঁড়ান এপস্টেইন ও গিলেইন। জেন ডো-র কাছে এপস্টেইন নিজেকে একজন শিল্প অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচয় দেন এবং জানান, তিনি প্রতিভাবান তরুণ শিল্পীদের বৃত্তি প্রদান করেন।  জেন ডোর বাবা এক বছর আগেই মারা গিয়েছিলেন। তার পরিবার তখন আর্থিক সংকটে ছিল। এপস্টেইন ও গিলেইন তার পরিবার, আর্থিক অবস্থা ও বাসস্থান নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করেন। যাওয়ার সময় এপস্টেইন তার মায়ের ফোন নম্বর চান। কয়েক মাস পরই তিনি ফোন করে তাঁদের (জেন ডো ও তার মা) চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান।  এটাই ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা দুঃস্বপ্নের শুরু। ২০২০ সালের একটি ক্ষতিপূরণ মামলায় এই ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে। নিজের পাম বিচের বিশাল বাড়িতে (যা পরে ভেঙে ফেলা হয়) বসে জেন ডো-র মাকে এপস্টাইন বলেন, তিনি মানুষকে সহযোগিতা করতে পছন্দ করেন। জেন ডোর মা খুশি হন এবং এপস্টেইনকে ‘গডফাদার’ বলে সম্বোধন শুরু করেন।  ১৪ বছর বয়সি জেন ডো এরপর থেকে নিয়মিতই এপস্টেইনের বাড়িতে যেতেন। সেখানে সুইমিংপুলে সময় কাটানো, সিনেমা দেখা, শপিং—এসব করে বেশ আনন্দই পাচ্ছিলেন তিনি। মাকে দেওয়ার জন্য এপস্টাইন তাঁকে নগদ অর্থও দিতেন। ভয়েস শেখার খরচও দিতেন।  সেই সময়টিতে এপস্টেইনের বাড়ির সুইমিংপুল এরিয়ায় প্রায়ই নগ্ন অবস্থায় শুয়ে থাকতেন গিলেইন। জেন ডো-র কাছে বিষয়টি একটু অদ্ভুত লাগত।

Advertisement
তবে গিলেইন বিষয়টিকে ‘এটা বড়দের কাজ’ বলে হালকা করে দিতেন। জেন ডো-র সঙ্গে তিনি বড় বোনের মতো আচরণ করতেন। কয়েক মাস পর পুল এরিয়ায় একা থাকা অবস্থায় জেন ডো-কে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জিজ্ঞেস করেন এপস্টেইন। জেন ডো জানান, অভিনেত্রী ও মডেল হতে চান। এপস্টেইন এ সময় জেন ডোকে বলেন, তিনি ফ্যাশন ও প্রসাধনী ব্র্যান্ড ‘ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট’-এর মালিকের বন্ধু। অভিনেত্রী ও মডেল হতে চাইলে ছবি তুলতে হবে এবং অন্তর্বাসে স্বচ্ছন্দ হতে হবে।  এরপর থেকেই শুরু হয় যৌন নির্যাতনের পর্বটি।

বছরের পর বছর ধরে এই নির্যাতন চলতে থাকে। ফাইলগুলোতে দেখা যায়, এপস্টেইন ও গিলেইনের নেটওয়ার্কে থাকা কিশোরী মেয়েরাই একে অপরকে নিয়ে আসত। ২০০৭ সালে এক সাক্ষ্যে ১৬ বছরের এক মেয়ে জানান, তার স্কুলের সহপাঠীই তাকে এপস্টেইনের জন্য কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে ম্যাসাজ দেওয়া, কাপড় খোলা, স্পর্শ—এসবের বিনিময়ে টাকা পাওয়া যেত। নতুন কাউকে এনে দিলে প্রতিজনের জন্য ২০০ ডলার করে দেওয়া হতো মেয়েদের।  নিয়ম ছিল—যত বেশি কাপড় খোলা, যত বেশি স্পর্শ করতে দেওয়া, তত বেশি টাকা।

২০০৪ ও ২০০৫ সালে এপস্টেইনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া মেয়েদের বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। সেই সময়টিতে একজনের বয়স ২৩ বছর ছিল বলে, তাকে ‘বুড়ো’ আখ্যা দিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এপস্টাইন বলতেন, ‘যত ছোট, তত ভালো।’  ভুক্তভোগীরা দীর্ঘদিন চুপ ছিলেন ভয়ে। জেন ডো প্রায় দুই দশক পর নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া গল্পটি প্রথমবারের মতো কাউকে বলেছিলেন। এপস্টেইন ও গিলেইনকে মেয়েরা ‘পরিবার’-এর মতো মনে করতেন। কারণ এই দুজন তাদের প্রতি ভালোবাসা দেখাতেন, কৃতজ্ঞতা অনুভব করাতেন। তবে ২০২০ সালে এক ভুক্তভোগী এক ইমেইলে গিলেইনকে ‘সাইকোপ্যাথ’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এপস্টেইনের জন্য মেয়েদের সংগ্রহ করার কাজটি মূলত তিনিই করতেন। পরে মেয়েদের গ্রুমিংয়েও বড় ভূমিকা রাখতেন। 

২০২৩ সালে আরেকজন এফবিআইকে লেখেন, তিনি সাক্ষ্য দিতে ভয় পান। নিজের নামটি জড়াতে চাননি। অনেকেরই আর্ট ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং ট্রমার কারণে অনেকের জীবনও ধ্বংস হয়ে গেছে।  চক্রটির শুরুর দিকে ১৯৯৬ সালেই মারিয়া ফার্মার নামে একজন এফবিআইকে অভিযোগ করেছিলেন। দাবি করেছিলেন, এপস্টেইন তার ১২ ও ১৬ বছরের বোনদের ছবি চুরি করে বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া তিনি সুইমিংপুলে মেয়েদের ছবি তুলতে বলেন, পুলিশের কাছে গেলে বাড়ি পুড়িয়ে দেবেন বলে হুমকি দেন। 

বিচার চলাকালে ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট কারাগারে থাকা অবস্থায় রহস্যজনকভাবে আত্মহত্যা করেন জেফরি এপস্টেইন। আর গিলেইন ম্যাক্সওয়েল ২০২১ সালে শিশু যৌন পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন।  উল্লেখ্য, এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের অধীনে চলতি সপ্তাহেই প্রায় ৩৫ লাখ পৃষ্ঠা, ২ হাজার ভিডিও ও ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি প্রকাশ করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। এসব নথিতে এপস্টেইনের কাছে আসা-যাওয়া করা বিশ্বের নামি-দামি অনেক ব্যক্তির পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তীব্র বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে।

Comments

No comments

Add a comment:

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন