নোয়াখালীতে শীতজনিত রোগে এক মাসে ১৮ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে সংকট

নোয়াখালীতে চলমান তীব্র শীতজনিত রোগে শিশুদের মৃত্যু ও অসুস্থতার হার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। গত এক মাসে শুধু নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালেই শীতজনিতসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এক হাজারের বেশি শিশু চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা জেলার স্বাস্থ্যসেবার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে।
এক মাসে ভর্তি ১ হাজার ৮৭ শিশু, মৃত্যু ১৮ জন
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ডিসেম্বর মাসের জরিপে এ চিত্র উঠে আসে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ডিসেম্বর মাসে শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও ভাইরাল ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পায়।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে শিশু ওয়ার্ড নম্বর–৪ এ মোট ৫৩২ জন শিশু ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ জন শিশুর মৃত্যু ঘটে। একই সময়ে ১৩ নম্বর শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হয় ৫৫৫ জন শিশু, যাদের মধ্যে আরও ৫ জন মারা যায়। সব মিলিয়ে এক মাসেই মোট ১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, মারা যাওয়া শিশুদের অধিকাংশই ঠান্ডাজনিত সংক্রমণ, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতায় আক্রান্ত ছিল। শীতকালে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এসব রোগ দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করে।আগের মাসগুলোতেও ছিল মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি
আগের মাসগুলোতেও ছিল মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি
হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি শুধু ডিসেম্বরেই সীমাবদ্ধ নয়। নভেম্বর মাসে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ১ হাজার ৪৭৫ জন শিশু ভর্তি হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ১৬ জন। এর আগের মাস অক্টোবরেও ১ হাজার ৩৭৬ জন শিশুর মধ্যে ২৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়। তবে অধিকাংশ শিশু চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়।
শয্যার সংকট, মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা
সরেজমিনে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। অনেক শিশুকে সিট না পেয়ে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও এক শয্যায় দু’জন শিশুকেও রাখা হয়েছে।
হাসপাতালের করিডোর, ওয়ার্ডের বারান্দা ও আশপাশের স্থানজুড়ে অসুস্থ শিশু ও তাদের স্বজনদের ভিড় দেখা গেছে। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য সেবা দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
রোগীর স্বজনদের কষ্টের কথা
লক্ষ্মীপুরের রামগাতি থেকে আসা শিশুর মা বিবি খাদিজা বলেন,
“তিন দিন আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আমার ছেলেকে এখানে ভর্তি করেছি। হাতে ক্যানুলা লাগানো, স্যালাইন ও ইনজেকশন চলছে। নাকে নেবুলাইজেশন দেওয়া হচ্ছে। ঠান্ডার কারণেই এমন অবস্থা হয়েছে।”
অন্যদিকে, শিশু রোগী মো. মামুনের মা সুফিয়া আক্তার বলেন, “সামান্য ঠান্ডা লাগলেই আমার ছেলের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এক মাসে দুইবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। গরিব মানুষের পক্ষে বারবার চিকিৎসা করানো খুব কষ্টের।”
নার্স সংকটে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত
শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ ও সিনিয়র স্টাফ নার্স রোকেয়া বেগম জানান, রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে নার্সদের মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “শিশু ওয়ার্ডগুলোতে নার্সের সংখ্যা খুবই কম। রোগীদের চিকিৎসা দিতে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। দ্রুত অতিরিক্ত নার্স নিয়োগ না দিলে সেবা মান বজায় রাখা কঠিন হবে।”
চিকিৎসকদের সতর্কতা ও পরামর্শ
শিশু বিশেষজ্ঞ ও কনসালট্যান্ট ডা. ইয়াকুব আলী মুন্সি বলেন,
“শিশু মৃত্যুর পেছনে শুধু শীতই দায়ী নয়। জন্মকালীন জটিলতা, সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, সেপসিস ও দুর্ঘটনাও বড় কারণ। তবে শীতকালে শিশুদের গরম কাপড় পরানো, ঠান্ডা বাতাস থেকে দূরে রাখা এবং অসুস্থ হলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে আনা অত্যন্ত জরুরি।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: জনবল বাড়ানো জরুরি
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন,
“নোয়াখালী ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে প্রতিদিন রোগীর চাপ অনেক বেশি থাকে। অথচ ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।”
শীত আরও বাড়ার আশঙ্কা
জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, নোয়াখালীতে গত কয়েকদিন ধরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, “দিনের বেলাতেও তাপমাত্রা ১৪ থেকে ১৫ ডিগ্রির মধ্যে থাকছে। এ অবস্থায় শিশু ও বয়স্কদের শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।”
সার্বিক উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের প্রকোপ আরও বাড়লে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং হাসপাতালগুলোর জনবল ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

Comments
Nobin
Thanks
Add a comment: