আড়াই বছরের প্রকল্প ১০ বছরেও হয়নি, ব্যয় বেড়েছে ১৬শ কোটি

অনলাইন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই ২০২৫


দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে ২০১৪ সালে দেশের ১০০ উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপনের প্রকল্প নেওয়া হয়। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আড়াই বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক দশকের বেশি অতিবাহিত হলেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ছয় দফা সময় বাড়ানোর পরও অগ্রগতি মাত্র ৭০ শতাংশ। নির্ধারিত মেয়াদের চেয়ে এক দশকের বেশি সময়েও প্রকল্প শেষ না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য তো পূরণ হয়নি; বরং বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণে খরচ বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণে অনুমোদনের চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। এখন নতুন করে আরও ১৮ মাস সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠিয়েছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

২০১৪ সালের শুরুতে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ৯২৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। কিন্তু সময় বাড়ার পাশাপাশি কয়েক ধাপে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫২৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ (টিএমইডি) প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও ১৮ মাস সময় চেয়ে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) পাঠিয়েছে।

টিএসসি প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল দেশের বড় জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি করা। প্রথম ধাপে ১০০টি উপজেলায় টিএসসি স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যা থেকে প্রতি বছর ১ লাখ ৮ হাজার কারিগরি শিক্ষার্থীর স্নাতক হয়ে বের হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। শুরু হওয়ার এক যুগ পরও প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। আরডিপিপিতে বলা হয়েছে, ১০০টির মধ্যে ৭২টি টিএসসি নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মধ্যে ৬৬টি প্রতিষ্ঠান শর্তসাপেক্ষে হস্তান্তরও করা হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতি স্থাপন, সাব-স্টেশন চালু এবং শিক্ষাক্রম চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো শেষ হয়নি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম ধাপে দুই বছর এবং ১ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রকল্প সংশোধন করা হয়। সংশোধিত মেয়াদেও কাজ শেষ না হওয়ায় আরও ৫৪ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ শেষ করতে না পারায় আরও তিন বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। দুই ধাপে পাঁচ বছর মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ করতে পারেনি কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর।

পরে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে নতুন করে আরও ১৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং তিন বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেই মেয়াদেও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় পঞ্চম ধাপে আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পাঁচ ধাপে প্রায় ১১ বছর এবং ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা বাড়িয়েও কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে।

তৃতীয় সংশোধনীতে নতুন করে আরও ৫ কোটি টাকা এবং দেড় বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আড়াই বছরের প্রকল্প ঠেকছে সাড়ে ১৩ বছরে। আর বারবার মেয়াদ বাড়ানোর ফলে ৯২৪ কোটি ৩ লাখ টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৫২৫ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ বারবার সংশোধন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যর্থতার কারণে ১০০ টিএসসি নির্মাণ প্রকল্প শেষ করতে অতিরিক্ত ১১ বছর এবং ১ হাজার ৬০১ কোটি টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।

Advertisement

সংশোধনের কারণ হিসেবে আরডিপিপি বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে অনেক টিএসসির নির্মাণ ব্যয় বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া সাব-স্টেশন স্থাপন, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে অপ্রত্যাশিত বিলম্বের কারণে খরচ বেড়েছে এবং নতুন সময়সীমা ও বাজেট অনুযায়ী ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজন। এ অবস্থায়, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৮০টি টিএসসির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও প্রকল্পের অবশিষ্ট ২০টি টিএসসির নির্মাণকাজ শেষ করে, শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, সরবরাহসহ অন্যান্য সব অঙ্গের কাজ শেষ করতে আরও ১ বছর ৬ মাস প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধিসহ প্রকল্পটি সংশোধন করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত দেড় বছরের জন্য প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এজন্য ব্যয় বাড়ানোর দরকার।

ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রমের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় প্রকল্প সমাপ্তির জন্য কমপক্ষে দেড় বছর মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। টিএসসির জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি আরডিপিপিতে প্রশাসনিক ব্যয় ও ওভারহেড খরচের হিসাবও পরিবর্তন করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন অর্থনৈতিক কোড যুক্ত হওয়ায় এসব ব্যয়ের আইটেম হালনাগাদ করতে হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) উদ্ধৃত করে প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে বেশি আয় করেন, যা প্রকল্পটির সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে; কিন্তু বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

শিক্ষা ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি দ্রুত যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও জনবল নিয়োগ সম্পন্ন না হয়, তাহলে অবকাঠামো নির্মাণ করেও প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে না। প্রকল্পটি যে উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল—যেমন, দারিদ্র্য হ্রাস, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং স্থানীয় ও বৈদেশিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি—সেটার বাস্তবায়ন এখনো দুরূহ।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ নতুন করে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠালেও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এত সময় ও অর্থ ব্যয়ের পরও প্রকল্পটি কি আদৌ কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে? পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ভালো হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, কার্যকর সমন্বয়ের অভাব এবং ঠিকাদারদের জবাবদিহিতার ঘাটতি প্রকল্পটিকে পিছিয়ে দিয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন অস্বাভাবিক ধীরগতির কারণ জানতে প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল কাসেম মোহাম্মদ জাহাংগীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রকল্প পরিচালকের ব্যবহৃত নম্বরে গত দুদিন ধরে বারবার ফোন দিলেও তার সাড়া মেলেনি। এ কারণে তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি অবহিত করে মন্তব্য জানতে চাইলে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ কালবেলাকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন ধীরগতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমন একটা নির্ধারিত মেয়াদে প্রকল্প শেষ করতে পারলে প্রকল্পের এত বেশি টাকা খরচ হতো না। বারবার মেয়াদ বাড়ানোর কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে, এটাকে অপচয় বললেও ভুল হবে, এটা চরম অপচয়। শুরু থেকে এই প্রকল্পের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

Comments

No comments

Add a comment:

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

কাজী গ্রুপ ও WWWA-এর আয়োজনে সংগীত সন্ধ্যা ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনো সোচ্চার হতে দেখি না: আসিফ নজরুল

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

ঢাকা থেকে রিয়াদ-দাম্মামের ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২১৯৩৩ যাত্রী

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, যে তথ্য দিল পুলিশ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নেই, এটাই শেষ কথা: আব্দুল হাই সাইফুল্লাহ

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? ফুটবল ছাড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন নেইমার

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

২৯ অক্টোবর এইচএসসির ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি ভুয়া

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন টম ক্রুজ

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

দ. কোরিয়াকে ‘বিরক্ত’ করতে সীমান্তে মাইক বাজাবে উ. কোরিয়া

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

যে ব্যবসায় বাজিমাত সামান্থার, আয় ১২০ কোটি রুপি

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করলেও লাগবে নিবন্ধন

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ডিভি লটারি: বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আফগানদের কাছে ৭ উইকেটে হেরে শূন্য হাতে ফিরছে বাংলাদেশ

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

আজ রাতে ঘুমালে আকাশের যা মিস করবেন

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে ছিল না সাজার তথ্য

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রিয়াদ

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন